শর্করা বা কারবোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের কি প্রয়োজন?
আমাদের শরীরকে কার্যকর রাখতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন হয় তার প্রায় সবটুকুই উতপাদিত হয় শর্করা বা কারবোহাইড্রেট জাতীয় খাবার থেকে। শর্করা জাতীয় খাবারের মূল উৎস হল উদ্ভিদ বা গাছ থেকে যে সব খাবার পাওয়া যায় সেগুলি, যেমন ফল, শাকসবজি, বিচি জাতীয় খাবার ইত্যাদি। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ছাড়া প্রাণী থেকে আসা কোনও খাবারে শর্করা পাওয়া যায় না।
শর্করা মূলত দুই ধরণের। সিম্পল কার্বোহাইড্রেট বা সরল শর্করা এবং কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট বা জটিল শর্করা। সিম্পল কার্বোহাইড্রেট, যাকে মাঝে মাঝে সিম্পল সুগারও বলা হয়, তাদের উদাহরণ হল ফ্রুক্টোজ (ফলের চিনি), সুক্রোজ (খাবার চিনি) এবং ল্যাক্টোজ (দুধের চিনি)। ফল হল সিম্পল কার্বোহাইড্রেটসের অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক উৎস। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটসও সুগার অণুর তৈরি, কিন্তু এতে নানা ধরণের সুগার অণু একত্রিত হয়ে একটি বড় অণু তৈরি হয়। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটসের উদাহরনহল ফাইবার ও স্টার্চ। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটসের প্রধান উৎস হল শাকসবজি, দানা ও বীজ জাতীয় খাবার।
বর্তমান সময়ে শর্করার প্রকারভেদ করা হয় নতুন একটি পদ্ধতিতে, যার নাম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। এটা মূলত একটি স্কোরিং সিস্টেম। কোন ধরণের শর্করা জাতীয় খাবার খেলে আমাদের রক্তে কি পরিমাণ গ্লুকোজ পাওয়া যায় তার প্রকাশ এই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স দিয়ে করা হয়। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এর দেখানো নম্বর বেশী মানে হল আপনার রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণও বেশী। যেসব খাবারের শর্করার পরিমাণ কম থাকে, সেগুলো খেলে এই গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রাও কম দেখাবে। গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মান যদি ৭০ বা তার বেশী দেখায় তবে রক্তে শর্করার পরিমাণ অনেক বেশী। যে মাত্রার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স রিডিঙকে স্বাস্থ্যকর মনে হয় তা হল ৫৬ থেকে ৬৯। সিম্পল কার্বোহাইড্রেটস খেলে রক্তে গ্লুকোজের এর মাত্রা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটসের চেয়ে বেশী বাড়ে। যেমন সাদা পাউরুটির তুলনায় চিনি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম বাড়ায়, কারণ চিনি বা টেবল সুগারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাদা পাউরুটির চেয়ে কম। উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আছে এমন খাবার খেলে ওবেসিটি বা মোটা হয়ে যাওয়া, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা বেড়ে যায়। সারকথা হল যেসব শর্করার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম সেগুলি বেশী স্বাস্থ্যকর। এ ধরণের খাবারের উদাহরণ হল ফলমূল, শাকসবজি, মাংস, তৈল এবং দুগ্ধজাত খাবার। দানা জাতীয় এবং প্রক্রিয়াজাত করা শর্করা জাতীয় খাদ্যের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণতঃ বেশী হয়।
রক্তে গ্লুকোজের প্রধান উৎস হল কার্বোহাইড্রেটস। গ্লুকোজই হল আমাদের শরীরের সমস্ত ধরণের কোষের শক্তির প্রধান উৎস। লাল রক্ত কণিকা এবং ব্রেইনের কোষের জন্য এই গ্লুকোজই একমাত্র শক্তির উৎস। সিম্পল কার্বোহাইড্রেট এবং কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট এই দুই ধরণের শর্করাই শরীরের ভেতরে গিয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। উৎপন্ন হওয়া এই গ্লুকোজ বিভিন্ন কোষে হয় সরাসরি ব্যবহৃত হয় এবং নয়ত লিভারে মজুদ হয়ে ধীরে ধীরে প্রয়োজনমত ব্যবহৃত হয়। কেউ যদি তার দৈনিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি খান, তবে অব্যবহৃত কার্বোহাইড্রেট ফ্যাট বা মেদ হিসেবে শরীরে জমা হতে থাকে।
ব্রেইনের কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য শর্করা জাতীয় খাবার খেলে কিছুটা শান্ত অনুভুতির সৃষ্টি হয় যে কারণে এটা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষদের জন্য কিছুটা উপকারী। অনেকেই এটাকে সুগার রাশও বলে।
ডায়েটের জন্য জন্য যদি শর্করা পছন্দ করতে হয়ে তবে সে তালিকাতে প্রক্রিয়াজাত নয় এমন ফলমূল, শাকসবজি, বীচি ও দানা জাতীয় খাবার রাখা উচিত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন কোমল পানীয়, ডেসার্ট, ক্যান্ডি এবং খাবার চিনি তালিকার বাইরে রাখা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়াজাত সিম্পল কার্বোহাইড্রেট খেলে একসময় ডায়াবেটিস ও হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া) এর ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রক্রিয়াজাত সিম্পল কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবারে সাধারণত চাহিদার অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবারও থাকে। একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েটে ফ্যাটের পরিমাণ সবসময় কম থাকা উচিত। ফ্যাট বেশী থাকার জন্যই কুকিজ ও কেকে অল্প পরিমাণ খাবারে অনেক ক্যালরি থাকে।
ফাইবার বা তন্তু সমৃদ্ধ খাবার কার্বোহাইড্রেটসের অন্যতম সেরা উৎস। আমাদের শরীর ফাইবারের সবটুকু হজম করতে পারে না। সবটুকু হজম না করতে পারলেও শরীরের জন্য ফাইবারের অনেক ভাল দিক আছে। প্রথমটা হল ফাইবার পানি আটকে রাখতে পারে ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না। ডায়েটে ফাইবার জাতীয় খাবার বেশী থাকলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। সেই সাথে পায়খানা পরিস্কার হয় ফলে পরিপাক্তন্ত্র পরিস্কার থাকে। ফাইবার এমন অনেক অণুর সাথে যুক্ত হতে পারে যাদের থেকে একসময় কোলেস্টেরল তৈরি হয়। ফাইবার এদের সাথে যুক্ত হবার ফলে এইসব অণুগুলো থেকে কোলেস্টেরল তৈরি হতে পারে না। এতে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম থাকে যা হার্ট এটাকের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়। আমাদের দৈনিক খাবারে অন্ততঃ ২৫ গ্রাম ফাইবার থাকা দরকার। ফাইবার মূলত পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রকারের ফলমূল ও শাকসবজি থেকে। এছাড়া দানা জাতীয় খাবারেও যথেষ্ট পরিমাণ ফাইবার থাকে। ফাইবার দুই ধরণের হয়, দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়। দ্রবণীয় ফাইবার বৃহদান্ত্রে হজম হয়, অদ্রবণীয় ফাইবার হজম হয়না, পায়খানার সাথে বেরিয়ে যায়।
একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েটে সবটুকু ক্যালরির অন্ততঃ ৫০-৬০% আসা উচিত কার্বোহাইড্রেট থেকে।

No comments