যে কারণে নারিকেল তৈলকে এখন “কড়া বিষ” ধরা হচ্ছে।
বেশি না, প্রায় দুই বছর আগেও নারিকেলের তৈলকে “সুপারফুড” ধরা হত। মনে করা হত এতে
শরীরের জন্য খারাপ কোনও কিছুই হতে পারে না। কোনও কারণ ছাড়াই বলা হত এটি মেদ ঝরাতে এবং
ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে, একারণে এটিকে সুপারফুডও ধরা হত। খুবই সাম্প্রতিককালে হার্ভার্ড
ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর বলেছেন যে নারিকেলের তৈল একটি কড়া বিষ। এর কিছুদিন আগে আমেরিকান
হার্ট এসোসিয়েশন একটি নির্দেশনায় পরামর্শ দেয় স্যাচুরেটড ফ্যাটি এসিড খাদ্য
তালিকাতে না নিতে, এর মাঝে নারিকেলের তৈলও আছে।
“সুপারফুড” থেকে “কড়া বিষ” হয়ে যাওয়াটা একটা বিরাট অধঃপতন। একাডেমী অব নিউট্রিশন
এন্ড ডায়েটেটিক্স এর মুখপাত্র এবং রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান হলেন মেলিসা মজুমদার।
তিনি বলেন নারিকেলের তৈলের অনেক উপকারী প্রভাব আছে বলে প্রচারিত থাকলেও নারিকেল তৈল
যে ডায়াবেটিস, ওজন কমানো, ক্রোন্স ডিজিস, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম এবং থাইরয়েডের সমস্যায়
উপকার করে এমনটা সমর্থন করে এমন কোনও পরীক্ষাভিত্তিক প্রমাণ হাতে নেই। হয়ত নারিকেল
তৈলের কিছু উপকারী দিক থাকতে পারে, যা নিয়ে এখনও গবেষণা চলমান, কিন্তু খাবারে এই তৈল
ব্যবহারের দিকে আমাদের অবশ্যই নজর দেয়া উচিত।
কি কি আছে নারিকেলের তৈলে?
এক টেবিল চামচ নারিকেলের তৈলে ক্যালরি থাকে প্রায় ১২০ ক্যালরি, যা অলিভ ও
ক্যানোলা তৈলের সমান। এরপর এই পরিমাণ নারিকেল তৈলে আছে প্রায় ১৩ গ্রাম স্যাচুরেটেড
ফ্যাট, যা রেকমেন্ডেড ডেইলি এলাউন্স বা দিনে যে পরিমাণ খেতে পরামর্শ দেয়া হয় তার প্রায়
৬৩%। এই কারণে যাদের কোলেস্টেরলের জন্য সমস্যা হয় তাদের এই তৈল খেতে সাবধান থাকতে
বলা হয়।
গত দশক বা তার কাছাকাছি সময়ে কিছু মানুষ প্রচার কড়া শুরু করে যে নারিকেলের তৈল
খুবই স্বাস্থ্যকর। এর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা আসে এরকমঃ নারিকেলের তৈলে আছে মিডিয়াম
চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড। অন্যান্য তৈলের চেয়ে নারিকেলের তৈলের ট্রাইগ্লিসারাইড চেইন
লম্বা। মিডিয়াম ও লম্বা ট্রাইগ্লিসারাইড আমাদের শরীর দ্রুত গ্রহন করতে পারে। ২০০৩
সালের একটি প্রকাশনায় বলা হয় যে মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড আমাদের হজমশক্তি বাড়িয়ে
দিতে পারে, যা ওজন কমানোর জন্য সহায়ক। আরেকটি প্রকাশনায় দাবি কড়া হয় যে মিডিয়াম
চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড হৃদযন্ত্রের আরটারী শক্ত হতে দেয়না, যা হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের
ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। কিন্তু এইসব গবেষণা গুলি কড়া হয়েছিল বিশুদ্ধ মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড
দিয়ে, নারিকেল তৈল দিয়ে নয়।
মেলিসা মজুমদার বলেন নারিকেল তৈল মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড এর মত আচরণ করে
কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে কারণ যেসব তৈলে মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড আছে শরীর যেভাবে
সেগুলি হজম করতে পারে, নারিকেল তৈল একই ভাবে হজম হয় না। নারিকেল তৈলের বেশিরভাগই
হলে এক ধরণের ফ্যাটি এসিড যার নাম লরিক এসিড। লরিক এসিড ভাল কোলেস্টেরল HDL এবং খারাপ
কোলেস্টেরল LDL দুটোকেই বাড়াতে সাহায্য করে। যাদের হৃদরোগের
পারিবারিক ইতিহাস আছে, তারা নিশ্চয়ই খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ুক এটা চান না।
মজুমদারের মত আরও যারা পুষ্টিবিদ আছে তারা দৈনিক স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাওয়ার পরিমাণ
মোট দৈনিক পরামর্শ দেয়া ফ্যাটের পরিমানের ৭-১০% এর মাঝে রাখতে পরামর্শ দেন। আমাদের
দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি দরকার হয় তার ২০-৩৫% এর বেশী ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার থেকে
আসা উচিত নয়। ৭-১০% হতে খুব বেশী নারিকেল তৈলের দরকার হয় না। মজুমদারের মতে নারিকেল
তৈল ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণের দিক দিয়ে মাখনের মত।
নারিকেল তৈল ব্যবহারের চেয়ে ক্যানোলা বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উচিত। এক টেবিল
চামচ ক্যানোলা তৈলে আছে এক গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট যা পরামর্শকৃত দৈনিক গ্রহণের সীমার
মাত্র ৫%। অন্যদিকে এক টেবিল চামচ অলিভ তৈলে আছে দুই গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট যা পরামর্শকৃত
দৈনিক গ্রহণের সীমার ৯%।
মেলিসা মজুমদার আরও বলেন “আমি
এমন কোন খাবারের কথা চিন্তাও করতে পারিনা যেটাকে বিষ বলা হয়েছে। আমি কোনও খাবার
নিয়ে মানুষকে ভয় দেখাতে চাই না, তবে স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকাতে আমি নারিকেল তৈলে
রাখবনা। আমার বাড়িতেও নারিকেল তৈল থাকে না।“

No comments