তিন দিনে যেভাবে রোম ঘুরবেন।
একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে “Roma non fu fatta in un giorno” । এর মানে হল রোম একদিনে তৈরি হয় নি।
রোম ঘোরা শুরু করলে এই বাক্যের সত্যতা বুঝতে আপনার বেশী সময় লাগবে না। প্রায়
প্রতিটি রাস্তাতেই রোমানদের রোমানরা শিল্পের কাজ কতটা যত্নশীল ছিল তা দেখতে পাবেন।
রোমের রাস্তায় হাঁটা মানে প্রায় ২০০০ বছরের পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গী হতে হতে হাঁটা।
মাঝে মাঝে মনে হবে আপনার মস্তিষ্কে চাপ পড়ে গেছে, কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন বুঝতে
পারছেন না। এতে হতাশ হবার কিছু নেই। যারা রোমের অধিবাসী, তাদেরও এই অনুভূতি হয়, আর
যদি ছবি তুলতে চান সমস্ত শিল্পকর্মের সাথে, তবে আপনি শেষ। এক কথায় পৃথিবীর যেকোনোও
শহরের চেয়ে রোমে দেখার মত জিনিস বেশী আছে।
পিয়াতজা ডি স্পাংনা। এর আরেক নাম হল স্প্যানিশ সিঁড়ি।
বসন্তে এই জায়গাটি ফুলে ফুলে ভরা থাকে।এই জায়গাটি ঘুরে বেড়ানোর জন্য খুবই ভাল জায়গা,
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। এর আশেপাশের জায়গাগুলিতে পাবেন রোমে শপিং করার সবচেয়ে উপযুক্ত
জায়গা। ভায়া ডেল করসোতে যাবেন। তবে ছেলেরা যাদের মেয়ে সঙ্গিনী আছে, তারা সাবধান।
কারণ তারা এখানে শপিং করতে খুবই পছন্দ করবে।
এতকিছু দেখার যদি থাকে, তবে একটা জায়গা থেকে শুরু করতে হয়। তাহলে
শুরুটা করতে পারেন কোথা থেকে?
প্রথম দিন যা যা দেখতে পারেন।
শুরু করুন “রোমান ফোরাম” বা "Foro
Romano" থেকে। ক্যাপিটোলাইন
এবং প্যালাটাইন এই দুটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই স্থাপনা রোম ঘুরে বেড়ানো শুরু
করার একটি খুবই ভাল জায়গা। কলোসিয়ামের পিয়াতজা ধরে সোজা এই প্রত্নতাত্বিক স্থাপনায়
আপনি হেঁটে যেতে পারবেন। কলোসিয়ামকে বলা হয় রোমের প্রতীক। এই বিশাল এম্ফিথিয়েটার
একসময় প্রায় ৫৫,০০০ লোকের সমাগম ধারণ করতে পারত। এখানে গ্ল্যাডিয়েটরের যুদ্ধ দেখতে
আসত প্রাচীন রোমের উচ্চ পর্যায়ের নাগরিকেরা। ৮০ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ
হতে লাগে প্রায় ১০ বছর। অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে এই থিয়েটারের উপর সামিয়ানা টাঙ্গানোর
ব্যবস্থা থাকত। একটি অনুষ্ঠান শেষ করে সমস্ত দর্শকের কলোসিয়াম থেকে বেরিয়ে যেতে
সময় লাগত মাত্র ১২ মিনিটের মত। এখন এটা ভাবা যায়?
রোমান ফোরাম ছিল প্রাচীন রোমের বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয়
কেন্দ্রস্থল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন চলমান, তার শুরুটা
এই প্রাচীন রোমেই, সম্রাট জুলিয়াস সিজারের শাসনামলে।
রোমে আপনার গাড়িতে চলাফেরা করা ঠিক হবে না, সবচেয়ে ভাল হয় যদি
হাঁটতে পারেন। এরপর যেখানে যাবেন সেটা হল “ট্রেভী ফাউন্টেইন”। যদি সন্ধ্যার দিকে যেতে
পারেন তবে এই ঝর্নায় আলোর খেলা দেখতে পারবেন। এখানে এসে কখনই পানিতে কয়েন ফেলতে ভুলবেন না। কারণ প্রবাদ আছে এটা
করলে আপনার ইচ্ছা পূরণ হবে।
দ্বিতীয় দিনে যা যা করতে পারেন।
আপনার সময়ের অন্ততঃ একদিন আপানাকে ভ্যাটিকান দেখতে ব্যয়
করতে হবে। ভ্যাটিকান জাদুঘর, সেইন্ট পিটারস ক্যাথেড্রাল এবং সিস্টিন চ্যাপেল ঘুরতে
হবে আপনাকে। ভ্যাটিকানে যাবার সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা হল পন্ট স্যান্ট এংলো সেতু
দিয়ে যজাওয়া। ভ্যাটিকান কিন্তু ইটালী থেকে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এটা ক্যাথলিকদের
জন্য আত্মিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সেইন্ট পিটারস ক্যাথেড্রালের ভেতরে ঢুকে হাতের ডান দিকে
পাবেন মাইকেলেঞ্জেলোর পিয়েটা ভাস্কর্য। মাইকেলেঞ্জেলোর বয়স যখন মাত্র ২৫ বছর ছিল, তখন
তিনি এটি তৈরি করেছিলেন। ভ্যাটিক্যান জাদুঘরে গেলে দেখতে পাবেন শত শত বছর ধরে সংরক্ষিত
অসংখ্য সম্পদ। জাদুঘর দেখা শেষ হলে অবশ্যই রাফায়েল রুম এবং সিস্টিন চ্যাপেলে যাবেন।
সিস্টিন চ্যাপেলের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যাপার হল এর ছাদ। এখানে বুক অব জেনেসিসের ঘটনাবলীর
ছবি আঁকা হয়েছে যা মাইকেলেঞ্জেলোর আরও একটি মাস্টারপিস। এই শিল্পকর্মটি সম্পন্ন
করতে মাইকেলেঞ্জেলোর প্রায় চার বছর সময় লাগে। মনে রাখবেন, যদি আপনি শর্টস, হাফ হাতা
বা তার চেয়ে ছোট হাতার জামা এবং হাঁটুর উপরে থাকা স্কারট পরে থাকেন, তবে কিন্তু
সেইন্ট পিটারস ক্যাথেড্রালে আপনাকে ঢুকতে দেবে না। প্রচন্ড গরম কালেও আপনাকে এই
নিয়ম মানতে হবে। আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে এটা একটা উপাসনার জায়গা। ২০০৩ সালের
গ্রীষ্ম ছিল ইউরোপের ৩০০ বছরের মাঝে উষ্ণতম গ্রীষ্ম। তখনও এই নিয়মের কোনও ব্যাত্যয়
হয়নি।
এরপর যেতে পারেন ক্যাসেল সন্টেঞ্জেলোতে। ১৩৮ সালে এটা তৈরি
হলেও ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটাকে একটি দুর্গে পরিণত করা হয়। এর নীচে একটি সুড়ঙ্গ আছে। নিরাপদে
ভ্যাটিকান যাবার প্রয়োজন হলে পোপ মাঝে মাঝেই এই সুড়ঙ্গ ব্যাবহার করতেন। এই
ক্যাসেলের ভেতরে অসংখ্য শিল্পকর্ম আছে এবং সেখানে গেলে রোমের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক
কিছু জানতে পারবেন। এর চতুর্থ তলায় একটা ক্যাফে আছে, যেখানে এক্সপ্রেসো খেতে খেতে আপনি
রোমের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
তৃতীয় দিনে যেখানে যেখানে যেতে পারেন।
রোমের বাজারগুলির মাঝে নাভোনা পিয়াতজা অনেক বিখ্যাত। এখানে
অসংখ্য চিত্রশীল্পিকে দেখতে পাবেন যারা প্রতিনিয়ত কারও না কারও স্কেচ বানিয়ে চলেছে।
সাথে রয়েছে অসংখ্য ক্যাফে। নোভানা পিয়াতজার একদম মাঝখানে দেখতে পাবেন বারনিনির তৈরি
মাস্টারপিস la
Fontana dei Fiumi বা নদীর ঝর্না। এই পিয়াতজার পশ্চিম
দিকে আছে একটি সুন্দর চার্চ, যার নাম সান্ট এগ্নেস। কথিত আছে যে এইখানে এগ্নেস কে উলঙ্গ
করে ফেলা হয় এবং প্রায় সাথে সাথেই তার শরীরে চুলের অলৌকিক উৎপাদন শুরু হয়ে এগ্নেস
কে আবৃত করে ফেলে। পিয়াতজার উত্তরদিকে আরও একটি ঝর্না আছে যার নাম La Fontana di Nettuno। ঘুরতে ঘুরতে দেখবেন অনেকেই রোমের এইসব ঝর্না থেকে পানি পান করছে। রোমের পানির
সিস্টেম প্রাকৃতিক ভাবেই রোমান সাম্রাজ্যের আমল থেকেই খুবই সমৃদ্ধ। এখন পর্যন্তও
সেটার কোন পরিবর্তন হয়নি। যদি কোথাও লেখা দেখেন "non
potabile" তবে এর মানে হল পান করার জন্য উপযুক্ত নয় সেই
পানি। এরপর দেখতে পারেন “দ্য প্যান্থিওন।“ দালানটি এখনও খুবই ভাল অবস্থায় আছে। এটিকে
তৈরি করা হয়েছিল যাতে রোমের নাগরিকেরা এখানে সকল দেব দেবীর উপাসনা করতে পারে। এর কনক্রিটের
তৈরি ডোমটি সারা পৃথিবীর মাঝে বৃহত্তম। যদি আরও কিছু কেনাকাটা করতে চান, তবে চলে যেতে
পারে ভায়া নাতজিওনালেতে, অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে জিনিসপত্রের দাম কিছুটা কম এখানে।


No comments