যেভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ কাজ করে। ২য় পর্ব।
স্যাটেলাইট
কাকে বলে?
যে কোনও
কিছু যদি কোনও জিনিসকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ বজায় রেখে প্রদক্ষিণ করে তবে তাকে স্যাটেলাইট
বলা যাবে। কক্ষপথ সাধারণত বাঁকানো হয়, সেই বাঁকানো কক্ষপথ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপবৃত্তাকার
হয়। উদাহরণ হিসেবে চাঁদ পৃথিবীর স্যাটেলাইট।
উৎপত্তি
অনুসারে স্যাটেলাইট দুই প্রকার। প্রাকৃতিক স্যটেলাইট যেমন পৃথিবীর চাঁদ, মঙ্গলের ফোবোস
ও ডেমোস। পরের প্রকার হল মানুষের তৈরি যেটাকে বলা কৃত্তিম উপগ্রহ। যেমন বঙ্গবন্ধু-১। ছবিতে দেখানো চাঁদ বাদে সবগুলিই কৃত্তিম উপগ্রহ।
স্যাটেলাইট
যে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথ বজায় রাখে সেটার কারণ জানতে হলে আবারও আমাদের আইজ্যাক নিউটনের
দেয়া ধারনার সাহায্য নিতে হবে। মনে আছে, নিউটন এক ধরণের বলের কথা বলেছিলেন, যার নাম
হল গ্র্যাভিটি? গ্র্যাভিটি হল সেই বল যা মহাকাশের দুটি বস্তুর মাঝে বিদ্যমান। যদি এই
বল না থাকত তবে স্যাটেলাইটের গতিপথ হত সরলরেখা। সেই সরলরেখার আরেক প্রান্তে থাকত অন্য
কোনও মহাজাগতিক বস্তুর একদম কেন্দ্রে।
একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথের একটি কেন্দ্র থাকে। সেই সাথে থাকে দুটি ফোকাস
পয়েন্ট যাদের একসাথে বলা হয় ফোকাই। স্যাটেলাইট যখন একটি কক্ষপথ স্থায়ী থাকে তখন সেখানে
গ্রাভিটি কাজ করে আর যাকে প্রদক্ষিণ করছে সেটা থাকে দুটি ফোকাস বিন্দুর একটিতে।
ফলে একটি কক্ষপথের সব জায়গাতে একই পরিমাণ গ্র্যাভিটি অনুভূত হয় না এবং সেই বলকে
সামঞ্জস্যতায় আনার জন্য স্যাটেলাইটের গতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। যখন এটি গ্রহের সবচেয়ে
কাছে চলে আসে তখন স্যাটেলাইট টির গতিবেগ সবচেয়ে বেশী থাকে। আর যখন সবচেয়ে দূরে চলে
যায় তখন গতিবেগ সবচেয়ে কম থাকে। সবচেয়ে কাছে থাকার এই বিন্দুর নাম হল “পেরিজি”, আর
সবচেয়ে দূরের বিন্দুর নাম “এপোজি।”
আকার, আকৃতি বা ব্যবহারের ধরন অনুসারে স্যাটেলাইট নানান রকমের হয় থাকে।
ওয়েদার বা আবহাওয়া স্যাটেলাইটঃ প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর কোন জায়গার আবহাওয়াকে পর্যবেক্ষণ
করতে এই ধরণের স্যাটেলাইট ব্যবহার হয়। যেমন জিওস্টেশনারী অপারেশনাল এনভাইরনমেন্টাল
স্যাটেলাইট বা GOES। এই ধরণের স্যাটেলাইটে সাধারণত খুবই
উচ্চমান সম্পন্ন ক্যামেরা থাকে যাতে যে জায়গার আবহাওয়ার খবর জানতে চাওয়া হচ্ছে সেখানকার
ছবিও তোলা যেতে পারে। এই ধরণের স্যাটেলাইট হয় জিওস্টেশনারী, নয়ত পোলার অরবিট হয়। জিওস্টেশনারী
মানে হল মনে করুন আপনি শুধু বাংলাদেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে চান, তাহলে স্যাটেলাইটের
গতিবেগ ও কক্ষপথ এমন থাকতে হবে যেন এটি সবসময় বাংলাদেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মত জায়গা
দিয়ে প্রদক্ষিণ করে। পোলার অরবিট মানে হল এটির কক্ষপথ দুই মেরুর উপর দিয়ে অতিক্রম করে।
কমিউনিকেশান
বা যোগাযোগ স্যাটেলাইটঃ এই ধরণের স্যাটেলাইটের বদৌলতেই আমরা টেলিফোনে কথা বলতে পারি।
এরকম উদাহরণ হল টেলস্টার ও ইন্টেলস্যাট। এই ধরণের স্যাটেলাইটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
অংশ হল “ট্রান্সপন্ডার।“ ট্রান্সপন্ডার হল
একধরণের রেডিও, যা একদিক থেকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সীর তথ্য নিয়ে অন্য দিক দিয়ে
সেটাকে এমপ্লিফাই করে অন্য ফ্রিকোয়েন্সীতে পৃথিবীতে পাঠায়। একটা স্যাটেলাইটে সাধারণত
১০০ বা হাজারেরও বেশী ট্রান্সপন্ডার থাকতে পারে।
ব্রডকাস্ট
স্যাটেলাইটঃ অনেকটা কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটের মত, তবে এই ধরণের স্যাটেলাইট দিয়ে টেলিভিশন
সিগন্যাল ট্রান্সমিট করা হয়।
নেভিগেশনাল স্যাটেলাইটঃ এই ধরণের স্যাটেলাইটের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হল GPS
NAVSTAR Satellites.
সায়েন্টিফিক স্যাটেলাইটঃ যেমন “হাবল স্পেস টেলিস্কোপ।“ এই ধরণের স্যাটেলাইট সূর্যের
কলঙ্ক থেকে শুরু করে গামা রে পর্যন্ত সবকিছু ধরতে পারে।
রেস্কিউ স্যটেলাইটঃ এরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রেডিও ডিস্ট্রেস সিগন্যাল উপযুক্ত
জায়গাতে পাঠায়।
আর্থ অব্জারভেশন স্যাটেলাইটঃ এই ধরণের স্যাটেলাইট দিয়ে পৃথিবীর কোথায় কোন ধরণের
পরিবর্তন হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। সবচেয়ে বিখ্যাত হল ল্যান্ডসেট সিরিজের
স্যাটেলাইটগুলি।
মিলিটারি স্যাটেলাইটঃ এগুলো
তাদের কক্ষপথে আছে, কিন্তু কোনটা কি কাজে ব্যবহার হয় তা তাদের মালিকপক্ষ ছাড়া অন্য
কেউ জানে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা এনক্রিপ্টেড কোড ব্যবহার করে যোগাযোগ চালায়। এই
ধরণের স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে মালিকপক্ষ তাদের শত্রুপক্ষের শক্তি ও কার্যক্রম
পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

No comments