যেভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ কাজ করে। ৩য় পর্ব।
প্রথম কবে স্যাটেলাইট আবিষ্কার হয়?
বিজ্ঞানী নিউটন মাথাতেই স্যাটেলাইটের ব্যাপারে চিন্তা সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, এই
চিন্তা বাস্তবে পরিণত হতে মানবজাতিকে বেশ ভালই বেগ পেতে হয়েছে। নিউটনের পর যে মানুষটি
স্যাটেলাইটের বাস্তবমুখী চিন্তা করেছিলেন, তিনি হলে আরথার সি ক্লার্ক। তিনি ১৯৪৫
সালে বলেন স্যাটেলাইট এমন ভাবে স্থাপন করা উচিত যেন এর গতির দিক হয় পৃথিবী যে দিকে
ঘুরছে সেদিকে এবং এর গতি হওয়া উচিত পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপরে ঘূর্ণন গতির সমান। তিনি
আসলে জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইটের কথা বলেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে এটাকে যোগাযোগের
জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
১৯৫৭ সালে অক্টোবর মাসের আগে অনেক বিজ্ঞানীই আরথার সি ক্লার্কের এই কথা মানতে
চান নি। অক্টোবর ৪, ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে। মানুষের তৈরি
এই ধাতব গোলকটির ব্যাস ছিল প্রায় ২৩ ইঞ্চি বা ৫৮ সেন্টিমিটার আর ভর ছিল ৮৩ কেজি বা
১৮৪ পাউন্ড। এটি মানবজাতির জন্য এক বিশাল অর্জন হলেও সেই সময় স্যাটেলাইটে যা থাকত
সেগুলি এখনকার তুলনায় কিছুই না। স্পুটনিক-১ এ ছিল থার্মোমিটার, ব্যাটারী, রেডিও
ট্রান্সমিটার যেটা তাপমাত্রার পরিবর্তন হলে বিপ বিপ করতে পারত আর স্পুটনিক-১ এর
ভেতরটায় চাপ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা নাইট্রোজেন। স্পুটনিক-১ এর বাইরের দিকে ছিল
চারট ছড়ির মত এন্টেনা যা শর্ট ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সী ট্রান্সমিট করতে পারত। উৎক্ষেপণের
পর মাটিতে থাকা গ্রাউন্ড ষ্টেশন স্পুটনিক-১ এর পাঠানো রেডিও সিগন্যাল ধরে নিশ্চিত
হয় যে এটি উৎক্ষেপণের ধাক্কা সহ্য করে অক্ষত আছে এবং সফলভাবে কাজ করছে। এর প্রায়
একমাস পর স্পুটনিক-২ নামে আরও একটি স্যাটেলাইট পাঠানো হয়। এই স্যাটেলাইটেই কুকুর
লাইকা’কে পাঠানো হয়েছিল।
চলমান “কোল্ড ওয়ার” এ টিকে থাকতে আমেরিকাও ১৯৫৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভ্যানগার্ড
রকেটে করে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের চেষ্টা করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি লঞ্চপ্যাডেই
বিস্ফোরিত হয়। মাস খানেক পর, জানুয়ারী ৩১, ১৯৫৮ সালে আমেরিকা রেড স্টোন রকেট ব্যবহার
করে এক্সপ্লোরার-১ মহাকাশে পাঠিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে প্রতিযোগিতায় সমান সমান
হয়। এতে নেতৃত্ব দেন রকেট ঈশ্বর বলে খ্যাত ওয়ারনার ভন ব্রাউন। এক্সপ্লোরার-১
কস্মিক রশ্মি ডিটেক্ট করার যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়েছিল। এর সাহায্য নিয়ে ইউনিভার্সিটি
অব আইওয়ার প্রফেসর জেমস ভ্যান এলেন দেখান যে পৃথিবীর কাছের মহাকাশে কস্মিক রশ্মির ঘনত্ব
ধারণার চেয়ে অনেক কম। এর ফলে আবিষ্কার হয় বিখ্যাত “ভ্যান এলেন বেল্ট” এর, যেখানে পৃথিবীর
ম্যাগনেটিক ফিল্ডের কারণে অসংখ্য চার্জড পার্টিকেল আটকা পড়ে আছে। এই দুই সাফল্যের
পর ৬০’র দশকে বেশ কিছু কোম্পানী স্যাটেলাইট পাঠাতে আগ্রহী হয়। এগুলোর মাঝে উল্লেখ্য
যোগ্য ছিল হুজেস এয়ারক্র্যাফট এবং তাদের তারকা প্রকৌশলী হ্যারল্ড রোজেন। হ্যারল্ড
রোজেন একটি দলের নেতৃত্ব দেন যারা আরথার সি ক্লার্কের দেয়া ধারণা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছিল।
তাঁরা একটি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বানান যার কাজ হবে পৃথিবীর এক জায়গা থেকে সিগন্যাল
সংগ্রহ করে অন্য জায়গাতে প্রেরণ করা। ১৯৬১ সালে নাসা হুজেস এয়ারক্র্যাফটকে সিনকন সিরিজের
স্যাটেলাইটগুলি বানানোর জন্য চুক্তি করে। ১৯৬৩ সালে রোজেন ও তার সহকারীরা সিনকন সিরিজের
২য় স্যাটেলাইট পাঠাতে সক্ষম হন। প্রেসিডেন্ট কেনেডি সিনকন-৩ স্যাটেলাইটের সাহায্যে
আমেরিকায় বসে আফ্রিকায় থাকা নাইজেরিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেন। কথোপকথনটি
এখানে পাবেন।
সেই সাথে শুরু হল
স্যাটেলাইটের যুগ, যা এখনও চলমান।

No comments