খাবারের প্যাকেটে থাকা লেবেলের তথ্য কিভাবে বুঝবেন?
পুষ্টিকর খাবার আমাদের সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি। পুষ্টিকর খাবার বলতে সেসব খাবারকেই বোঝায় যেসব খাবারকে আমাদের শরীর খুব সহজেই হজম করতে পারে। প্রধান পুষ্টি উপাদান বা নিউট্রিয়েন্টস মূলত চারটি। পানি, শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট, আমিষ বা প্রোটিন এবং ফ্যাট বা চর্বি। এগুলোকে প্রধান পুষ্টি উপাদান বলা হচ্ছে কারণ আমাদের শরীর গঠনের আসল কাজ গুলি মূলত এরাই করে। এই নিউট্রিয়েন্টসগুলি বাদে আরও কিছু নিউট্রিয়েন্টস আমাদের দরকার হয়, তবে খুবই কম পরিমাণে, যেগুলোকে বলা হয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস। যেমন ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, মিনারেল বা খনিজ পদার্থ ইত্যাদি। একটি খাবার আমাদের শরীরের জন্য কতটুকু উপকারী তা বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে খাবারটিতে কোন কোন নিউট্রিয়েন্টস আছে এবং তা কি পরিমাণে আছে।
গ্রাহকেরা যাতে সহজেই একটি খাবারে কি কি পুষ্টি উপাদান আছে তা জানতে পারে, সে জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্যাকেটজাতভাবে বাজারজাতকৃত খাদ্যদ্রব্যে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ দিয়ে একটি তালিকা দেয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এই প্রচলন আছে। তালিকাটি দেখতে এই পোস্টের সাথে দেয়া ছবিটির মত। দেশ অনুসারে ভাষার পরিবর্তন থাকতে পারে। এই তালিকা হয়ত আপনাকে ওই নির্দিষ্ট খাবারে থাকা পুষ্টি উপাদানের একদম সঠিক পরিমাণ দেখাবে না, কিন্তু একটা পরিমাণগত ধারণা দেবে। মনে রাখতে হবে যে শাকসবজি, মাংস, মাছ, ডিম, খাঁটি দুধ, ফলমূল এবং ঘরে তৈরি খাবারে কোন রকম নিউট্রিশান লেবেল থাকবে না। প্যাকেটজাত খাবারের চেয়ে এসব খাবারই বেশী স্বাস্থ্যকর, কারণ এগুলো প্রক্রিয়াজাত খাবার নয়। প্রক্রিয়াজাত খাবার বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উতপাদিত হওয়াতে তার পুষ্টিউপাদান অনেকখানি কমে যায়, একই সাথে কিছু কিছু উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যায় যেগুলো বেশী পরিমাণে থাকা আমাদের শরীরের জন্য ভাল নয়, যেমন প্রক্রিয়াজাত খাবারে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশী থাকে এবং পটাশিয়ামের পরিমাণ কম থাকে।
তো যাই হোক, এত কথা বাদ দিয়ে চলুন জেনে নিই প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটে থাকা এসব লেবেলের তথ্য কিভাবে বুঝবেন।
প্যানেল ১, সারভিং সাইজঃ একটি লেবেলে যেসব তথ্য দেয়া থাকে তার শুরু হয় সারভিং সাইজ থেকে। এক সারভিং সাইজের ভর কত তা এখানে দেয়া থাকে। যেমন ছবির এই লেবেলে এক সারভিং সাইজ বলতে ২২৮ গ্রাম বোঝাচ্ছে। মনে করু আপনি এক বসায় ২২৮ গ্রাম খেলেন ওই খাবারটি, তার মানে আপনি এক সারভিং সাইজ খাবার খেলেন। যদি ৪৫৬ গ্রাম খেয়ে ফেলেন, তবে খেলেন দুই সারভিং। লেবেলের বাকী যা তথ্য থাকে তা সবই এই সারভিং সাইজের পরিমানের উপর নির্ভর করে দেয়া হয়। আলাদা আলাদা খাবারের সারভিং সাইজ আলাদা আলাদা পরিমাণের হয়।
প্যানেল ২, ক্যালরিঃ ছবির লেবেলটিতে ক্যালরি দেয়া আছে ২৫০ ক্যালরি যা ওই খাবারটির ২২৮ গ্রামের মোট ক্যালরি। আপনি যদি ২২৮ গ্রামের বেশী খাবারটি খান তবে ২৫০ ক্যালরির বেশী খেলেন, আবার যদি ২২৮ গ্রামের কম খান তবে ২৫০ ক্যালরির কম খেলে। “ক্যালরিস ফ্রম ফ্যাট ১১০” মানে হল ওই ২৫০ ক্যালরির কমপক্ষে ১১০ ক্যালরি আসবে ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার থেকে। যদি আপনি চর্বি না খেতে চান তবে এই খাবারটি পরিহার করতে পারেন। একটা নিয়ম সবার মানা উচিত যে, যদি কোনও খাবারের মোট ক্যালরির ৩০% এর বেশী চর্বি থেকে আসে তবে সে খাবার খাওয়া উচিত নয়। এই খাবারটি ক্যালরি প্রায় ৫০% এসেছে চর্বি জাতীয় খাবার থেকে।
প্যানেল ৩ঃ এই প্যানেলে বিভিন্ন ধরণের খাদ্য উপাদানের তথ্য দেয়া থাকে যেগুলির পরিমাণ নিয়ন্ত্রনে রাখা উচিত। যেমন ফ্যাট, কারবোহাইড্রেট, কোলেস্টেরল, সুগার, সোডিয়াম ইত্যাদি। লেবেলটিতে বলা হচ্ছে এতে ১২ গ্রাম ফ্যাট আছে যার মাঝে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা খারাপ ফ্যাট আছে ৩ গ্রাম। একইভাবে কোলেস্টেরলের পরিমাণ আছে ৩০ মিলিগ্রাম এবং সোডিয়াম আছে ৪৭০ মিলিগ্রাম। এই প্যানেল আরও দেখাচ্ছে যে খাবারটিতে শরীরের জন্য উপকারী ডায়েটারী ফাইবার নেই এবং চিনির পরিমাণ ৫ গ্রাম। সেই সাথে আমিষ বা প্রোটিন আছে ৫ গ্রাম। এই সবই আসলে ওই ২২৮ গ্রামের মাঝে কোনটা কতটুকু আছে তারই খতিয়ান।
প্যানেল ৪ঃ এই প্যানেলে সাধারণত শরীরের জন্য উপকারী মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস যেমন বিভিন্ন ধরণের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের পরিমাণ দেখানো হয়।
প্যানেল ৫ঃ এই প্যানেলে সাধারণত বিভিন্ন ধরণের ক্যালরি লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বিভিন্ন ধরণের নিউট্রিয়েন্টস এর পরিমাণ কেমন হওয়া উচিত, তা দেয়া থাকে। যেমন কারও দৈনিক ক্যালরি লক্ষ্যমাত্রা যদি ২০০০ ক্যালরি হয়, তবে চর্বি বা ফ্যাট জাতীয় খাবার থাকা উচিত ৬৫ গ্রামের চেয়ে কম। যদি ক্যালরি লক্ষ্যমাত্রা ২৫০০ ক্যালরি হয় তবে ফ্যাটের পরিমাণ ৮০ গ্রামের কম হলেও চলবে।
একটি প্যাকেটের লেবেল দেখে যদি বুঝতে চান খাবারটি আপনার সংগ্রহ করাটা ঠিক হবে কি হবে না, তাহলে আপনার চাহিদা আপনাকে জানতে হবে, সেই সাথে জানতে হবে খাবারের বিভিন্ন উপাদানের বিভিন্ন পরিমাণের উপকারীতা এবং অপকারীতা। এতে খাবারটি আপনাকে সঠিক পুষ্টি দিচ্ছে কিনা, দিলে তা কোন কোন উপাদান কি কি পরিমাণে দিচ্ছে, এবং না দিকে কি কি উপাদান দিচ্ছেনা তা সম্পর্কে সজাগ থাকতে পারবেন। যা সুস্থভাবে জীবনধারণ অনেকখানি সহজতর হবে।
এই পোস্টে দেয়া তথ্যের কোন অংশ সঠিক নয় মনে হলে জানাতে দ্বিধা করা অনুচিত হবে। আপনার দেয়া সময়ের জন্য ধন্যবাদ।

No comments