বিশ্ব কাঁপানো দশটি আবিষ্কার, যাদের আবিষ্কর্তা নারীরা। প্রথম পর্ব।
পৃথিবীর
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে বেশীরভাগ বিখ্যাত নেতা, দার্শনিক বা আবিষ্কর্তা পুরুষ। তারপরও
এমন অনেক জিনিস আছে, যেগুলি নারীরা আবিষ্কার করেছেন যেগুলোর ব্যাপারে আমরা জানি এবং
করতে ভালবাসি। এইসব আবিষ্কারগুলিও মানবজাতির অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এবং রেখে চলেছে।
চলুন দেখে নিই দশটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার যেগুলির আবিষ্কর্তা নারীরা।
১০। ইলেক্ট্রিক রেফ্রিজারেটর।
রেফ্রিজারেটরের আবিষ্কারের আগে মানুষ খাবার সতেজ রাখার জন্য আইসবক্স বা বরফের
বাক্স ব্যবহার করত। আইসবক্সে প্রতিটি তাকের নীচে বরফ রাখতে হত। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই
এই বরফ সংগ্রহ করা হত শীতকালে এবং তা যতদিন পারা যায় সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হত।
কিরকম কঠিন কাজ সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে।
এই কষ্টের দিন শেষ হল ফ্লোরেন্স পারপারটের হাত ধরে। এই মহিলার ব্যাপারে ইতিহাসে
খুব কমই উল্লেখ আছে। পেটেন্ট রেকর্ড ঘেঁটে রেফ্রিজারেটরের আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর
নাম পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু একটা বাদ যাচ্ছে না? হ্যাঁ, ইলেক্ট্রিসিটি ব্যাপারটা
নেই এখানে। তাই তিনি এমনভাবে একটি রেফ্রিজারেটর ডিজাইন করেন যেটাতে ইলেক্ট্রিক সার্কিট
ব্যবহার করে এর ভেতরটা ঠান্ডা রাখা যেতে পারে। কিন্তু কি দিয়ে ঠান্ডা রাখতে পারা যাবে?
হ্যাঁ, গ্যাস। রেফ্রিজারেটর ঠাণ্ডা থাকে কিছু তরল পদার্থকে গ্যাসে পরিণত করে। যেমন
ফ্রিয়ন। তরল থাকা অবস্থায় এই ফ্রিয়ন খাবার বা ফ্রিজে রাখা পদার্থ থেকে তাপ শুষে
নেয়। এই গ্যাসকে আবার তরলে পরিণত করা হয় এবং এই প্রক্রিয়া চলমান থাকে। যে তরল ব্যবহার
করা হয় তাদের বলা হয় রেফ্রিজারেন্টস।
৯। লেপ্রসীর প্রথম চিকিৎসা।
মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রে নামের এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়া এই রোগের জন্য দায়ী।
এই রোগে চামড়ায় ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং ওই স্থানের স্নায়ু নষ্ট হয়ে যাবার ঝুঁকি থাকে।
এই রোগে শরীরের চামড়ার রঙের পরিবর্তন হয়ে যায়। এই রোগের কথা ইতিহাসেও পাওয়া যায়।
এই রোগ চামড়া, ব্রেইন, মিউকাস মেম্ব্রেন, চোখ, মুখ এমনকি নাকেও দেখা যায়। এই রোগের
চিকিৎসা খুবই কষ্টসাধ্য। কিছু মহামারী বাদ দিলে মানুষ এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রনের মাঝেই
রাখতে পেরেছে।
প্রথম এই রোগের সফল চিকিৎসা আবিষ্কার করেন যিনি তাঁর নাম এলিস বেল। এই রোগের ঔষধ
হল চাউল্মোগ্রা তৈল। এই গাছের বীজ থেকে এর তৈল নিষ্কাশন করতে হয়। কিন্তু সমস্যা হল
এই তৈল মুখ দিয়ে সেবন করলে বমি হত। আবার ইঞ্জেকশন দিলেও তা ভালোমত ছড়িয়ে পড়ত না। যেখানে
ইঞ্জেক্ট করা হত ওই জায়গাতেই জমা হয়ে থাকত। এলিস বেল একজন কেমিস্ট ছিলেন। যে
ফ্যাটি এসিডের কারণে চাউল্মোগ্রা তৈল ছড়াত না, সেটী তিনি আলাদা করে বাকি অংশ শরীরে
প্রয়োগ করেন। এতে এই ঔষধ আগের চেয়ে বেশ ভালোভাবে কাজ করে।
৮। উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার।
এটাকে নতুন করে চিনিয়ে দেবার কিছু নেই। বৃষ্টি সময় এই জিনিসটার জন্য চালকেরা
নিরাপদে গাড়ি চালাতে পারেন। এর আবিষ্কারক হলে ম্যারি এন্ডারসন। ১৯০৩ সালের ১০ই নভেম্বর
তিনি একটি ডিভাইসের পেটেন্ট করান যেটি গাড়ির ভেতর থেকে জানালার বা উইন্ডশিল্ডের
বাইরে জমা বৃষ্টির পানি বা তুষার পরিস্কার করতে পারেন। ১৯০২ সালে তাঁর সামনে ঘটে যাওয়া
একটি দুর্ঘটনা দেখার পর এই জিনিসটার আইডিয়া তাঁর মাথায় আসে। এটা আবিষ্কারের আগে বৃষ্টি
বা তুষারপাতের সময় নিরাপদে গাড়ি চালাতে হলে গাড়িচালককে সামনে কি আছে তা দেখার জন্য
জানালার বাইরে দিয়ে তাকাতে হত। পেটেন্ট করা হলে ম্যারি এন্ডারসনের পথচলা সহজ ছিলনা।
তিনি তাঁর পেটেন্ট কে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেবার জন্য অসংখ্য কোম্পানীর দ্বারে
দ্বারে ঘুরেছেন। বেশিরভাগ কোম্পানীই তাঁর এই আবিষ্কারকে ব্যবহারের অনুপযোগী ও মূল্যহীন
বলেছিল। তাই জীবদ্দশায় তিনি এই আবিষ্কারের জন্য এক পয়সাও লাভবান হননি। ১৯০৩ সালে
১৭ বছরের জন্য এই করা হলে ১৯২০ সালে পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়।
৭। সিরিঞ্জ।
মেডিকেল সম্পর্কিত আবিষ্কার মানেই ট্রায়াল এন্ড এরর। আর প্রাচীনকালের কথা বললে
ব্যাপারটার খুবই ভয়ঙ্কর ছবি ভেসে উঠবে চোখে। আজকে আমরা ইঞ্জেকশনের জন্য যে সিরিঞ্জ
দেখি, তা একদিনের আবিষ্কার নয়।
১৮৯৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী লেটিশিয়া মাম্ফোরড গিয়ার সিরিঞ্জের প্রথম পেটেন্ট
করেন। সিরিঞ্জের আরও অনেক ডিজাইন আগে থেকেই বাজারে ছিল, কিন্তু ব্যবহার করার দিক
দিয়ে এটার চেয়ে সুবিধা আরও কোনও ডিজাইনে ছিলনা। যদিও এখন গিয়ারের ডিজাইনের সিরিঞ্জ
পরিবর্তন পেয়ে ডিস্পোজেবল সিরিঞ্জ হয়েছে, কিন্তু তিনি দেখিয়ে গেছে জিনিসটা কেমন হওয়া
উচিত।
৬। ওয়াই ফাই।
অভিনেত্রী হেডী ল্যামার যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমন বুদ্ধিমতীও ছিলেন। তিনি নাৎসিদের
থেকে নতুন জীবনের জন্য আমেরিকায় পালিয়ে আসেন। তিনি ওই সময়ের হলিউডের অন্যতম নামকরা
ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। তারকাখ্যাতি পাবার আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেলিকমিউনিকেশন
খাতে সিগন্যাল সমস্যা কমানোর কিছু প্রজেক্টে কাজ করতেন। তাঁর করা অনেক ডিজাইনের মাঝে
একটি হল ওয়াই ফাই। তাঁর বিভিন্ন আবিষ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে নাৎসিদের অনেক সাহায্য করেছিল।
দুঃখের ব্যাপার হল, তাঁর নামে এই পেটেন্ট থাকলেও তিনি এই আবিষ্কার থেকে আর্থিক
ভাবে লাভবান হননি। তাঁর এই আবিষ্কার ২য় বিশ্বযুদ্ধে অনেক জীবন বাঁচিয়েছিল। এই আবিষ্কারে
প্রায় ৫০ বছর পর ল্যামার তাঁর আবিষ্কার ব্যপকভাবে কাজে লাগতে দেখেন। ল্যামার ৮৬ বছর
বয়সে অরল্যান্ডো, ফ্লোরিডায় মারা যান।





No comments