প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবারের কি প্রয়োজন?
আমিষ ছাড়া আমাদের শরীরের বৃদ্ধি হওয়া সম্ভব নয়। শরীরে নানা ধরণের হরমোন, এন্টিবডী, এনজাইম ও টিস্যু তৈরি হতে আমিষের দরকার হয়। শরীরের এসিড-ক্ষার সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতেও আমিষের ভূমিকা অনেক।
যখন আমরা আমিষ খাই, সেগুলি ভেঙ্গে নানা ধরণের এমিনো এসিডে পরিণত হয়। এই এমিনো এসিড থেকেই শরীর তার জন্য প্রয়োজনীয় আমিষ বা প্রোটিন তৈরি করে নেয়।
যেহেতু এমিনো এসিড শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়, তাই এই এসিডকে সামঞ্জস্যতায় আনার জন্য ক্ষার তৈরি করতে পারে এমন খাবার যেমন ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া খুবই দরকার। শরীরে কাজে লাগে এমন এমিনো এসিডকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হল “নন এসেনশিয়াল”। নন এসেনশিয়াল মানে এমন নয় যে এগুলোর প্রয়োজন নেই, এই নামের কারণ হল এসব এমিনো এসিড যেহেতু শরীর নিজে থেকেই তৈরি করতে পারে, তাই বাইরে থেকে এগুলো নেয়ার দরকার পড়ে না। দ্বিতীয় ধরণের এমিনো এসিড হল “এসেনশিয়াল”। এই ধরণের এমিনো এসিড শরীর তৈরি করতে পারে না, তাই খাবারের মাধ্যমে এগুলো সরবরাহ করা লাগে।
আমাদের শরীরে যখনই পেশী তৈরি হওয়া লাগে তখনই শরীরের আমিষ বা প্রোটিন তৈরির দরকার হয়। শরীর যখন তার প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করে তখন নানা ধরণের এমিনো এসিড লাগে। এদের কিছু কিছু শরীর নিজে থেকেই বানাতে পারে, কিছু কিছু খাবার থেকে শরীর আহরণ করে। যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনও প্রকারের এমিনো এসিডের অভাব থাকে, তবে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া চলমান থাকে না এবং শরীরের পেশী তৈরির কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এইসময় আমাদের ব্রেইন অন্য পেশী থেকে ওই ধরণের প্রোটিন ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেয়, যাতে পেশী তৈরির কার্যক্রম সচল থাকে। যখন এমিনো এসিডের অভাব খুবই প্রবল হয় তখন ক্যাকেক্সিয়া দেখা দিতে পারে, এতে শরীরের ওজন কমে যায়, পেশী কমে যায় সেই সাথে শরীর খুবই ক্লান্ত থাকে। ক্যান্সারের আক্রান্ত রোগীদের মারা যাবার অন্যতম কারণ হল এই ক্যাকেক্সিয়া।
প্রতিদিন আমাদের খাদ্য তালিকাতে এমন খাবার থাকা উচিত যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের এমিনো এসিড সরবরাহ করতে পারে। কোন কোন ধরণের এমিনো এসিড পাওয়া যাচ্ছে তা উপর ভিত্তি করে খাবার থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটা হল “কমপ্লিট প্রোটিন।“ কমপ্লিট প্রোটনে এসেনশিয়াল এমিনো এসিডের প্রায় সবগুলি পাওয়া যায়। কমপ্লিট প্রোটিন পেতে গেলে আপনাকে মাংস, ডিম, মাছ, পোল্ট্রি বা মুরগী, পনির এবং দুধ খেতে হবে। ২য়টা হল “ইনকমপ্লিট প্রোটিন”, যেগুলিতে এসেনশিয়াল এমিনো এসিডের কিছু কিছু পাওয়া যায়। এসব প্রোটিন পাওয়া যায় দানা জাতীয় খাদ্য, কান্ড জাতীয় খাদ্য এবং সবুজ পাতা সমৃদ্ধ শাকসবজিতে।
আমাদের শরীরের জন্য এসব ধরণের প্রোটিন খুবই দরকার হলেও এদেরকে যে শুধুমাত্র মাংস, মাছ ও পোল্ট্রি থেকেই নিতে হবে এমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। এর কারণ হল যে খাবারে প্রোটিন থাকে, সেই খাবারে চর্বি বা ফ্যাটও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে। বর্তমান সময়ে পোল্ট্রি ও গবাদিপশু উৎপাদনে যে পরিমাণ এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তাতে এসব খাবার খুব দেখেশুনে গ্রহন করা উচিত। অনেক প্রানীজ প্রোটিন এখন হরমোনের ব্যবহার ছাড়া উতপাদিত হয়, এতে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির সম্ভবনা অনেকখানি কমে আসে। প্রানীর চামড়াতে প্রচুর ফ্যাট থাকে, তাই চামড়া খাওয়া উচিত নয়। ডেইরী পণ্যের ক্ষেত্রে লো-ফ্যাট বা ফ্যাট-ফ্রি পণ্য খাওয়া উচিত। এগুলো মেনে চললে হার্ট এটাকের ঝুঁকি কম রেখে সব ধরণের এমিনো এসিড সমৃদ্ধ আমিষ খাওয়া যাবে।
মিউচুয়াল সাপ্লিমেন্টেশান ডায়েট স্ট্র্যাটেজীর নাম হয়ত শুনে থাকবেন। এই ধরণের ডায়েটে কিছু কিছু প্রয়োজনীয় এমিনো এসিড আছে এমন অনেক ধরণের খাবার একসাথে করে ডায়েট প্ল্যান করা হয়। যেমন বীচি জাতীয় খাবারে কিছু কিছু এমিনো এসিড আছে যা বাদামী ভাতে নেই, আবার বাদামী ভাতে কিছু কিছু এমিনো এসিড আছে যা বীচি জাতীয় খাবারে নেই। কিন্তু যদি দুটি খাবারকে একসাথে খাওয়া হয়, তবে সব ধরণের এমিনো এসিড আমরা পেতে পারি। যদি এভাবে খেলে শরীরের জন্য দরকারী সব এমিনো এসিড সমৃদ্ধ প্রোটিন পাওয়া যায়, তবে মাংস খাবার দরকারটা কমে যায়।
সমস্যা হল আমরা অনেকেই এক বসায় অনেক বেশী পরিমাণে খাবার খেয়ে ফেলি। শরীর তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তখনি ভালভাবে তৈরি করতে পারে যখন একসাথে অনেক সরবরাহ না করে অল্প অল্প করে নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। দিনে যদি আপনার ৫০-৬০ গ্রাম প্রোটিন দরকার হয় এবং আপনি মাংস ও ডেইরী পণ্য খাওয়া বন্ধ করে দেন, তবে আপনাকে অবশ্যই তার বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।
সকল ধরণের সয়াবীন পণ্য, যেমন তোফু এবং সয়াদুধ হল কমপ্লিট প্রোটিন। এতে যথেষ্ট পরিমাণ ফাইবার ও সয়া থাকে যা প্রোটিনের অন্যতম স্বাস্থ্যকর উৎস। সয়াবীন থেকে পাওয়া ক্যালরীর অন্ততঃ ৩৫-৩৮% আসে প্রোটিন থেকে, যার মাঝে থাকে আট ধরণের এসেনশিয়াল এমিনো এসিড এবং ভিটামিন বি৬। এমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন এর মতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে দিনে অন্ততঃ ২৫ গ্রাম সয়া প্রোটিন খাওয়া উচিত। যদি মাংস ছাড়া প্রোটিন চান তবে তোফু, সয়াবীন তৈল, সয়া ময়দা, সয়া পনির খেতে পারেন। গাঁজনকৃত বা ফারমেন্টেড সয়া পণ্য যেমন মিসো, টেম্পেহ, গাঁজনকৃত তোফু এবং সয়াদুধে যথেষ্ট পরিমাণ আইসোফ্ল্যাভোনস থাকে। আর গাঁজনকৃত হবার জন্য এতে বেটা-গ্লুকান, গ্লুটাথায়োন এবং কয়েক ধরণের ভিটামিন বি থাকে।
লো-ফ্যাট ইয়োগারট বা দধি কমপ্লিট প্রোটিনের একমাত্র প্রানীজ উদাহরণ যা প্রতিদিন খাওয়া যায়। ফুল-ফ্যাট ইয়োগারটে প্রচুর স্যাচুরেডটেড ফ্যাট থাকে যা এড়িয়ে চলা উচিত। দুধ থেকে দধি বানানো হয় কিছু ব্যাক্টেরিয়ার সাহায্যে। যেমন ল্যাক্টোব্যাসিলাস এসিডোফিলাস। হজমের জন্য আমাদের শরীরে কিছু উপকারী ব্যাক্টেরিয়া দরকার হয়, না হলে ক্যান্ডিডিয়াসিস বা এর মত নানা রোগ হবার ঝুঁকি তৈরি হয়। ইয়োগারট ক্যালসিয়ামেরও একটি ভাল উৎস। কখনও সুইটেনড বা ফ্লেভারড ইয়োগারট খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে অতিরিক্ত চিনি ও প্রিজারভেটিভস থাকে। যদি আনসুইটেনড ইয়োগারট খেতে ভাল না লাগে তবে বাজার থেকে তা কিনে তাতে বাড়িতে তৈরি করা ফলের রস মিশিয়ে সেটাকে মিষ্টি করা যেতে পারে। ইয়োগারট তৈরির জিনিসপত্র তুলনামূলক সস্তা।

No comments