যদি চাঁদে থাকতে চাই।
যারা ৭০’র দশকে বড় হয়েছেন তারা এপোলোর চাঁদের মিশনগুলোর সাথে ১৯৬৮ সালে মুক্তি
পাওয়া ২০০১ঃদ্য স্পেস অডিসি দেখেছেন। তাদের অনেকেই ভাবতেন বর্তমান নাগাদ মানুষ হয়ত
চাঁদে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু চন্দ্র বিজয়ের প্রায় ৫০ বছর হতে চললেও চাঁদে বসতি
গড়ার কোনও সম্ভবনাই দেখা যাচ্ছে না। খুব সহসাই যে মানুষ চাঁদে বাস করা শুরু করছেনা
তা বেশ নিরাপদেই বলা যায়। তবুও এটি একটি অসাধারণ চিন্তা। চাঁদে বাস করা, ছুটি
কাটানো এবং কাজ করতে পারলে খুবই ভাল অভিজ্ঞতা হতে পারত।
ধরে নিই মানুষ চাঁদে বসবাস করছে। তবে চাঁদে বসবাস শুরু করার আগে কিছু মৌলিক জিনিসের
দীর্ঘ মেয়াদে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এসবে মাঝে আছেঃ
-
শ্বাস
নেবার মত বাতাস
-
পানি
-
খাবার
-
প্রেশারাইজড
শেল্টার
-
পাওয়ার
সবচেয়ে ভাল হয় যদি এসব জিনিসের কিছু অংশ চাদেই উৎপাদন করা যায়। কারণ চাঁদে জিনিসপত্র
পাঠানোর খরচ হবে অসম্ভব রকমের বেশী। প্রতি কেজিতে ১০০,০০০ মার্কিন ডলারেরও অনেক বেশী।
এক গ্যালন পানির ভর হল ৮ পাউন্ড বা সাড়ে তিন কেজি, চাঁদে এর দাম পড়বে প্রায় ৪০০,০০০ মার্কিন
ডলার। এই যদি দামের অবস্থা হয় তবে পৃথিবী থেকে যত কম জিনিস নেয়া যায় তত ভাল। আরও
ভাল হয় যদি চাঁদে কোনভাবে এর উৎপাদন করতে পারা যায়।
শ্বাস নেবার জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে অতটা বেগ হয়ত পেতে হবে না, কারণ
চাঁদে অক্সিজেন উৎপাদন সহজই হবে। চাঁদের মাটিতে অক্সিজেন আছে, তাপ ও বিদ্যুৎ
ব্যবহার করে অক্সিজেন তৈরি করাটা কঠিন হয়ত হবে না।
পানির উৎপাদন করাটা বেশ কঠিন হয়ে যাবে। ইদানিং চাঁদের মাটির নীচে এবং মেরু অঞ্চলের
মাটির নীচে কিছু পানির বরফের অস্তিত্ব আবিষ্কার হয়েছে। যদি পানির মাইনিং সম্ভব হয়
তবে এটা অনেক সমস্যার সমাধান করে দেবে। পানি পান করা ও চাষের জন্য লাগবে, তাছাড়া
পানি থেকে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানী হিসেবেও কাজে লাগানো যাবে।
যদি চাঁদে পানি না পাওয়া যায় তবে তা পৃথিবী থেকে আমদানী করতে হবে। এক কাজ করা যেতে
পারে। পৃথিবী থেকে তরল হাইড্রোজেন এনে চাঁদ থেকে পাওয়া অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া
করে পানি উৎপাদন করা যেতে পারে। যেহেতু পানির ভরের ৬৭% হল অক্সিজেন ও বাকীটা
হাইড্রোজেন, তাই এই পদ্ধতিতে পানি উৎপাদনই সস্তা হবে। এর আরেকটা সুবিধা হল
হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলে পানি তৈরির সময় বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে বিদ্যুতও উতপাদিত
হবে।
খাবারের ব্যাপারটাও একটি সমস্যা। একজন মানুষ বছরে প্রায় ২২০ কেজি ডিহাইড্রেটেড
খাবার খায়। একটি সম্পূর্ণ কলোনীর সব মানুষের জন্য কয়েক টন খাবারের প্রয়োজন হবে। খাবারের
ব্যাপারে পৃথিবীর যে কোনও মানুষের প্রথম যে চিন্তাটা আসবে সেটা হল “চাঁদে ফসলের চাষ
করতে হবে।“ আমরা এইভাবে চিন্তা করি কারণ পৃথিবীতে মৌলিক পদার্থ যেমন কার্বন,
নাইট্রোজেন ইত্যাদির প্রাচুর্য অনেক। তাছাড়া মাটিতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ থাকে
যা গাছের বৃদ্ধির জন্য খুবই দরকার। এক টন গম উৎপাদন করতে প্রচুর পরিমাণে কার্বন, নাইট্রোজেন,
অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি সহ আরও অনেক কিছু লাগে। চাঁদে এর উৎপাদন
করতে হলে যেসব জিনিস চাঁদে পাওয়া যায়না সেসবের সবটুকু পৃথিবী থেকে নিয়ে আসা লাগবে।
যখন প্রথমবারের ফসল সফলভাবে উৎপাদন সম্পন্ন হবে, তখন ফসল ব্যবহার শেষে বিভিন্ন ধরণের
পুরোন জিনিসপত্র আবার ব্যবহার করা যাবে। যেমন গাছ জন্মাবে, মানুষ সেটা খাবে, কঠিন
ও তরল আবর্জনা তৈরি হবে এবং মানুষ প্রশ্বাসের সময় কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করবে। এইসব
আবর্জনা পরের চক্রের ফসল উৎপাদনের সময় পুষ্টি দেবার কাজ করবে। এরকম একটা চক্র শুরু
করতেও কিন্তু প্রচুর খাবার ও রাসায়নিক পদার্থের দরকার হবে।
যদি এবার শেল্টার বা বাসস্থানের ব্যাপারটাতে যাওয়া হয় তএ প্রথম যে ধরণের বাসস্থান
ব্যবহার করতে হবে যেগুলোকে বাতাসের সাহায্যে ফুলিয়ে বড় করা যায়। এ ধরণের জিনিসপত্র
পৃথিবী থেকে আমদানি করতে হবে। তবে চাঁদে ধাতু ও সিরামিক দিয়ে তৈরি কোনও দালান তৈরি
করতে পারার সম্ভবনা নিয়েও প্রচুর গবেষণা হয়েছে।
চাঁদে আরেকটি জিনিস নিয়ে বেশ সমস্যা তৈরি হবে। সেটা হল পাওয়ার। চাঁদে হয়ত
সোলার সেল তৈরি করতে পারা সম্ভব হবে, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সূর্যের আলো
পাওয়া যাবে। আগেই বলা হয়েছে যে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় পানির সাথে সাথে
কিছু বিদ্যুতও উৎপাদন সম্ভব হবে। চাঁদের ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে নিউক্লিয়ার
পাওয়ারেরও ব্যবস্থা করা সম্ভবপর হতে পারে।
উপরের সমস্ত তথ্য দেখে বুঝতে পারার কথা কেন মানুষ এখনও চাঁদে কলোনী গড়তে
পারেনি। ধরা যাক চাঁদে ১০০ জন মানুষ থাকার মত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কলোনী বানানোর চেষ্টা
করা হল। আরও ধরা হল যে কলোনী শুরুও করা হল এবং এজন্য ওই ১০০ জনের প্রত্যেকের জন্য যা
যা পৃথিবী থেকে চাঁদে নিয়ে আসা লাগবে সেসব উপাদান ভর সহ দেয়া হলঃ
- মানুষটি
নিজে ২০০ পাউন্ড বা ৯০ কেজি।
- প্রথম
এক বছরের জন্য প্যাকেট করা খাবার বা খাবার উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য প্রায় ২২৮
কেজি।
- বাসস্থানের
জন্য প্রাথমিক জিনিসপত্র প্রায় ৪৫০ কেজি।
- উৎপাদনের
যন্ত্রপাতি প্রায় ৪৫০ কেজি।
তাহলে কি দাঁড়াল? একেক জনের জন্য প্রায় ১৪০০ কেজি জিনিসপত্র বা পুরো কলোনী ধরলে
সব মিলিয়ে প্রায় ১৪০,০০০ কেজি। জ্বালানী ছাড়া একটি স্পেস শাটলের অরবিটারের ভর থাকে
প্রায় ৭৫,০০০ কেজি। যদি প্রতি কেজি জিনিস চাঁদে পাঠাতে খরচ হয় ১১০,০০০ মার্কিন
ডলার। তাহলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চাঁদে পাঠাতে খরচ হবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার। এটা শুধুমাত্র পাঠানোর খরচ। এর সাথে স্পেস শাটল ডিজাইন, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, অন্যান্য
প্রশাসনিক খরচ ধরা হয় নি। শুধুমাত্র ইন্টান্যশনাল স্পেস স্টেশন কক্ষপথে সম্পূর্ণভাবে
স্থাপন করতে খরচ হয়েছিল ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা লো আর্থ অরবিটে আছে। তাহলে
চাঁদে মানুষের কলোনী করতে খরচ প্রায় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে চলে যাবে। এক ট্রিলিয়ন
মানে হল ১০০০ বিলিয়ন।

No comments