যেভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ কাজ করে। ৮ম পর্ব।
স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ।
মাটিতে থাকা অবস্থায় কোনও স্যাটেলাইটকে পরিচিত বস্তুর মতই লাগে। এগুলো হয় চারকোণা
বাক্সের মত হয় নয়ত সিলিন্ডারের মত হয়। কিন্তু কক্ষপথের পৌঁছাবার পর মাটি থেকে এদের দেখতে মোটেও পরিচিত কিছুর মত মনে
হয় না। স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ করা খুবই দুরহ একটি কাজ। এর একটি উপায় হল এগুলো পৃথিবীকে
কিভাবে প্রদক্ষিণ করছে তা জানা। মনে আছে যে স্যাটেলাইটের কক্ষপথ দুই ধরণের হয়ে থাকে?
হয় বৃত্তাকার নয়ত উপবৃত্তাকার। কিছু কিছু স্যাটেলাইটের যাত্রা শুরু হয় উপবৃত্তাকার
কক্ষপথে, পরে কিছু সংশোধনমূলক নাড়াচাড়া দিয়ে এই কক্ষপথকে একটি বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিণত
করে দেয়া হয়। বাকিরা সবাই উপবৃত্তাকার কক্ষপথে চলে। আরেক ধরণের কক্ষপথ আছে যাদের
বলা হয় মলনিয়া অরবিট। এগুলি একটু অতিরিক্তই উপবৃত্তাকার। মলনিয়া কক্ষপথে থাকা
স্যাটেলাইটগুলি সাধারণত পৃথিবীর উত্তর থেকে দক্ষিণ দিক দিয়ে যায়। এসব স্যাটেলাইট
১২ ঘন্টায় একবার পৃথিবীকে ঘুরে আসে।
যেসব স্যাটেলাইটের কক্ষপথ মেরুর উপর দিয়ে যায়, এগুলি তাদের একাবার সম্পূর্ণ ঘূর্ণনে
দুটি মেরুই ঘুরে আসে, যদিও এই ধরণের কক্ষপথ একটু কম উপবৃত্তাকার হয়। পোলার অরবিটে থাকা
স্যাটেলাইটের কক্ষপথ থেকে পৃথিবীকে দেখলে মনে হবে এর মধ্য দিয়ে পৃথিবী পাক খাচ্ছে।
এতে পৃথিবীর বেশীরভাগ অংশই স্যাটেলাইটের কাভারেজের মাঝে চলে আসে। এই ধরণের কক্ষপথে
থাকা স্যাটেলাইটগুলি সাধারণত ম্যাপিং ও ফটোগ্রাফির কাজে ব্যবহার হয়। আবহাওয়ার জন্য
ব্যবহার করা হয় পোলার অরবিটে থাকা এক গুচ্ছ স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক, যেগুলি প্রতি
১২ ঘন্টায় একবার সম্পূর্ণ পৃথিবী কাভার করতে পারে।
যদি স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ করতেই হয় তবে তাদের কক্ষপথের উচ্চতা অনুসারে করা যেতে
পারে। এই পদ্ধতিতে স্যাটেলাইটকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
১) লোয়ার আর্থ অরবিট বা LEO ঃ এসব স্যাটেলাইটের
কক্ষপথের উচ্চতা হয়ে থাকে ১১১ মাইল থেকে ১.২৪৩ মাইলের ভেতরে। এই ধরণের কক্ষপথ মিলিটারী
ও আবহাওয়ার জন্য ব্যবহার করা স্যাটেলাইটের জন্য উপযুক্ত।
২) জিওসিনক্রোনাস
অরবিট বা GEOঃ এসব স্যাটেলাইটের উচ্চতা হয়ে থাকে ২২,২২৩ মাইলের বেশী। এদের গতি আর পৃথিবীর
ঘূর্ণন গতি সমান হয়ে থাকে, ২৪ ঘন্টা। এদের মাঝে আছে জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইটগুলি। এসব
স্যাটেলাইট পৃথিবীর সাপেক্ষে সবসময় একই স্থানে আছে বলে মনে হয়। সব জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইটই
যে জিওস্টেশনারী তা কিন্তু না। কোনও কোনটার কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। কোনও
কোনটার অরবিট আবার নিরক্ষরেখার উপর দিয়ে যায় না, কিছু ডিগ্রী উত্তর বা দক্ষিণে
হেলে থাকে। জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইট গুলি যেহেতু সবসময় একই অবস্থানে থাকে তাই
এগুলোর অবস্থান হয় নিরক্ষরেখার উপরে। শত শত টেলিভিশন, যোগাযোগের স্যাটেলাইট এবং আবহাওয়ার
স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারী অরবিট ব্যবহার করে।
মিডিয়াম-আর্থ অরবিট বা MEOঃ এই ধরণের
কক্ষপথের উচ্চতা হয় ১,২৪৩ মাইল থেকে ২২,২২৩ মাইলের মাঝে। আমরা গাড়িতে বা ফোনে যে
জিপিএস ব্যবহার করি, সেই স্যাটেলাইটগুলি এই ধরণের কক্ষপথে আছে।
বিভিন্ন সময়ে কক্ষপথে পাঠানো স্যাটেলাইটগুলি কি দেখছে তার উপরে ভিত্তি করেও
প্রকারভেদ করা যায়। মহাকাশের যত স্যাটেলেইট পাঠানো হয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই কাজ
হল পৃথিবীতে কি হচ্ছে তা দেখা। এসব স্যাটেলাইটের বিভিন্ন ধরণের ক্যামেরা আছে, যেগুলি
দিয়ে আলোর বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে পৃথিবীর ছবি তোলা যায়। অতিবেগুনী বা দৃশ্যমান বা
অবলোহিত আলোয় তোলা এসব ছবির মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর নানা রকমের পরিবর্তন দেখতে পাই।
কিছু কিছু স্যাটেলাইটের চোখ আছে বাইরে মহাকশের দিকে। সেগুলি তাদের “চোখ” দিয়ে অন্য
গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সী, গ্রহাণু, ধুমকেতু ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে চলেছে
প্রতিনিয়ত।

No comments