যেভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ কাজ করে। ৯ম পর্ব।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট।
এই তো বেশিদিন
আগের কথা নয়, কোনও দেশের স্যাটেলাইট থাকা ব্যাপারটা তাদের জন্য খুবই গর্বের ধরা হত।
দেশগুলি স্যাটেলাইট দিয়ে কি করে তা টপ সিক্রেট রাখত। এসব স্যাটেলাইট দিয়ে মূলত নিজেদের
ও শত্রুপক্ষের বিভিন্ন জিনিসের দিকে খেয়াল রাখা ও এসপিওনাজের কাজে লাগানো হত। কিন্তু
এখন স্যাটেলাইট আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমরা যে টেলিভিশন দেখি তার
অনেক চ্যানেলেই দেখতে পাই মূলত DIECTV ও DISH নেটওয়ার্কের কল্যাণে। আমাদের গাড়িতে ও
স্মার্টফোনে আজ যে GPS আছে, যা আমাদের গন্তব্য খুঁজে পেতে সাহায্য করছে, সেটাও তো স্যাটেলাইটের
জন্যই। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্য মহাকাশের বিভিন্ন জায়গার যেসব অসাধারণ ছবি তোলা
হচ্ছে, সেটিও একটি স্যাটেলাইট। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে তো অনেক মানুষ গবেষণার
কাজে থেকেই যাচ্ছে।
চলুন এসবের
বাইরেও যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট কক্ষপথে আছে তাদের ব্যাপারে জেনে নিই।
ল্যান্ডস্যাটঃ এই সিরিজের স্যাটেলাইটগুলি ৭০’এর দশক থেকে পৃথিবীর ছবি পাঠিয়ে যাচ্ছে।
ল্যান্ডস্যাট-১, যেটি পরিচিত ছিল আর্থ রিসোর্সেস টেকনোলজি স্যাটেলাইট (ERTS), পাঠানো হয় জুলাই ২৩, ১৯৭২ সালে। এতে দুটি প্রাথমিক যন্ত্র
ছিল যার একটি হল RCA’র তৈরি একটি ক্যামেরা এবং একটি মাল্টিস্পেক্ট্রাল স্ক্যানার, যেটি
সবুজ, লাল এবং আরও দুটি অবলোহিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ডেটা রেকর্ড করতে পারত। এই স্যাটেলাইটের
পাঠানো ডেটা গুলি বিজ্ঞানীদের খুবই কাজে লাগে এবং পরবর্তীতে আরও এই সিরিজের স্যাটেলাইট
পাথানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ল্যান্ডস্যাট সিরিজের সর্বশেষ স্যাটেলাইট ল্যান্ডস্যাট-৮
পাঠানো হয় ফেব্রুয়ারী ৮,২০১৩ তে। এতে দুটি আর্থ অব্জারভিং সেন্সর আছে,
একটি হল অপারেশনাল ল্যান্ড ইমেজার অন্যটি হল থার্মাল ইনফ্রারেড সেন্সর। এগুলো বিভিন্ন
তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোতে পৃথিবীর সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা, মেরু এলাকা, দ্বীপ ও মহাদেশীয়
অঞ্চলের ছবি তোলার কাজ করছে। এই সিরিজের পরবর্তী স্যাটেলাইট ল্যান্ডস্যাট-৯ ২০২০
সালে পাঠানোর সম্ভবনা আছে।
জিওস্টেশনারী অপারেশনাল এনভাইরনমেন্টাল স্যাটেলাইটস (GOES) সিরিজের স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবীকে জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথে
প্রদক্ষিণ করে চলেছে। প্রত্যেক স্যাটেলাইট পৃথিবীর দিকে খেয়াল রাখছে একটি নির্দিষ্ট
ও অপরিবর্তনীয় জায়গা থেকে। এই স্যাটেলাইটের কাজ হল আবহাওয়ার পরিবর্তনের শুরুটা ধরা।
এই স্যাটেলাইট থেকে টর্নেডো, হারিকেন, হঠাৎ বন্যা এবং বজ্রসহ ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া
যায়। এই স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে আবহাওয়াবিদেরা কোথায় কতটূকু বৃষ্টি হবে, কতটূকু
বরফ পড়বে, সমুদ্রে বা হ্রদে ভাসতে থাকা একটি বরফখন্ড কতদূর গেল
এসব হিসাব সঠিকভাবে রাখতে পারেন। ১৯৭৪ সালে ১৫ টি GOES স্যাটেলাইট একসাথে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়।
জেসন-১
ও জেসন-২ পৃথিবীর মহাসাগর গুলিতে গবেষণায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নাসা
ডিসেম্বর ৭, ২০০১ সালে জেসন-১ উৎক্ষেপণ করে। ১৯৯২ সাল থেকে কাজ করা NASA/CNES
Topex/Poseidon স্যাটেলাইটের স্থলাভিষিক্ত করা হয় জেসন-১ কে। প্রায় ১২ বছর ধরে জেসন-১
সমুদ্র তলদেশের ম্যাপ, সাগরে বাতাসের গতিবেগ এবং ঢেউয়ের উচ্চতা অন্তত ৯৫% নিখুঁতভাবে
শনাক্ত করতে সাহায্য করে। নাসা জুলাই ৩, ২০১৩ সালে অফিসিয়ালি জেসন-১ এর কার্যক্রম বন্ধ
করে দেয়। ২০০৮ সালে নাসা ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যান্ডেনবারগ এয়ার ফোরস বেজ থেকে জেসন-১
এর একটি উত্তরসূরি পাঠায়, জেসন-২। জেসন-২ এ যেসব যন্ত্রপাতি ছিল তা দিয়ে স্যাটেলাইট
থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের মাঝের দুরত্ব খুবই নিখুঁতভাবে বের করা যেত যাতে ভুলের সম্ভবনা থাকত
সবচেয়ে বেশী হলেও এক সেন্টিমিটার। এই স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়েই বিজ্ঞানীরা কোন জায়গাতে
সমুদ্রের স্রোতের গতিবেগ কত এবং মহাসাগর কি পরিমাণ তাপ শোষণ করছে তা বের করতে পারতেন।

No comments